মেয়েটি (নক্ষত্রের রাত-৩) – হুমায়ূন আহমেদ

নক্ষত্রের রাত - হুমায়ূন আহমেদ

পাশা লাউঞ্জের এক প্রান্তে ঘুমিয়ে-থাকা মেয়েটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। অবাক হবার মূল কারণ মেয়েটির সৌন্দর্য নয়। চেহারা সাধারণ বাঙালী মেয়েদের মত। শ্যামলা রঙ, বৃত্তাকার মুখ। চাপা নাক। এশীয় মেয়েদের মধ্যে অপুষ্টিজনিত কারণে যে-কোমল ভাব থাকে, তা অবশ্যি আছে।

পাশা অবাক হয়েছে, কারণ মেয়েটির গায়ে আসমানী রঙের শাড়ি আর সোয়েটারটির রঙ লাল। মাথায় জড়ান মাফলারটি ধবধবে সাদা রঙের। যা কল্পনা করা হয়েছিল, তাই।

কাকতালীয় যোগাযোগ, বলাই বাহুল্য। হঠাৎ করে মিলে যাওয়া। তবু কিছুটা কি রহস্যময় নয়? কল্পনার সঙ্গে বাস্তব এতটা কি কখনো মেলে? প্রবাবিলিটি অবশ্যি সব কিছুরই থাকে। তবু সেই প্রবাবিলিটি কি খুব কম নয়?

পাশা নিঃশব্দে মেয়েটির চেয়ারের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বেচারি আমেরিকা আসার উত্তেজনায় নিশ্চয়ই ক রাত ঘুমাতে পারে নি। প্লেনে ঘুমানর প্রশ্নই ওঠে না। এখানে তাই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এসেছে। কেমন অসহায় লাগছে। মেয়েটিকে। এত কমবয়সী একটি মেয়ে একা-একা চলে এসেছে এত দূর? আশ্চর্য তো! ঘুমাক খানিকক্ষণ। এই ফাঁকে আরেক কাপ কফি খাওয়া যেতে পারে। পাশা ভেণ্ডিং মেশিনের দিকে এগিয়ে গেল।

পৃথিবীর কুৎসিততম পানীয়ের একটি হচ্ছে ভেণ্ডিং মেশিনের কফি। পঞ্চাশ সেন্ট খরচ করে বিস্বাদ খানিকটা গরম পানি গেলার কোন অর্থ হয় না। তবু ভেণ্ডিং মেশিন দেখলেই সবার পয়সা ফেলে কিছু কিনতে ইচ্ছা করে।

ফরিদের এ ব্যাপারে একটা থিওরি আছে। তার বিখ্যাত এ্যানালাইটিক্যাল রিজনিং। যন্ত্র মানুষকে খাবার দিচ্ছে, এটা অদ্ভুত ব্যাপার। যাবতীয় অদ্ভুত ব্যাপারে মানুষ কৌতূহলী। এই কৌতূহলের কারণেই ভেণ্ডিং মেশিন দেখামাত্র লোকে পয়সা ফেলে। যার কফি খাবার কোনোই ইচ্ছা নেই, সেও কফি কেনে এবং দু চুমুক দিয়ে কাগজের কাপটি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

আজকের কফি খারাপ নয়। টাটকা এক গন্ধ। তিতকুটে কোনো ভাব নেই। এক চুমুক দেবার পর দ্বিতীয় চুমুক দেবার ইচ্ছা হয়। পাশা কফির কাপ হাতে নিয়ে রেবেকার সামনের চেয়ারটায় বসল।

কল্পনার তিনটি রঙ কীভাবে বাস্তবের তিন রঙের সঙ্গে মিলে গেল, এই নিয়ে ফরিদের মতো খানিকক্ষণ এ্যানালাইটিক্যাল রিজনিং করলে কেমন হয়?

সোয়েটারের রঙ লাল হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এশিয়ান মেয়েরা লাল রঙ পছন্দ করে। ওদের গরম কাপড়ের শতকরা আশি ভাগ হচ্ছে লাল। যেমন আমেরিকান মেয়েদের পছন্দের রঙ হচ্ছে গোলাপী।

মাফলার সাদা রঙের হবার কারণ হচ্ছে–মাফলারটি বানান হয়েছে সোয়েটার কেনার পর, রঙের সঙ্গে মিলিয়ে। লালের সঙ্গে দুটি কম্বিনেশন চলে–একটি হচ্ছে কালো, অন্যটি সাদা। কালো মেয়েদের অপছন্দের রঙ, কাজেই মাফলার বানান হল সাদা রঙের।

রাত দুটো দশ মিনিটে অকারণে তার ঘুম ভাঙার রহস্য পরিষ্কার হল। এ্যান নামের মেয়েটি নিশ্চয় তাকে বেশ কয়েক বার টেলিফোন করেছে। টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙেছে। যখন সে জেগে উঠছে তখন আর টেলিফোন বাজছিল না। এ্যান ২৬২

লাইন কেটে দিয়ে আবার করেছে।

পাশা ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সে আজকাল এত ভাবছে। কেন? এটা কি বয়সের লক্ষণ? নাকি মাথা খারাপ হতে শুরু করেছে?

ফরিদের মতো একদিন মাঝরাতে সেও কি ছুটে রাস্তায় নেমে চেঁচাতে শুরু করবে–নিউক্লিয়ার ওয়ার হ্যাজ স্টার্টেড। এটেনশন এভরিবডি, নিউক্লিয়ার ওয়ার।

কী কাণ্ড সেই রাতে। ডরমিটারির অর্ধেক ছাত্র বের হয়ে এল। কৌতূহলী হয়ে দেখল দৃশ্যটি। তারপর আবার যে যার কাজে চলে গেল। টার্ম ফাইন্যাল সামনে। তামাশা দেখার সময় নেই। রাতদুপুরে একটি কালো চামড়ার ছেলে যদি চেঁচামেচি শুরু করে, তাতে কিছুই আসে যায় না। হয়তো মদ খেয়ে আউট হয়ে গেছে কিংবা……

রেবেকা অবাক হয়ে লোকটিকে দেখছে। ইনিই বোধহয় পাশা চৌধুরী। এমন চেনা-চেনা লাগছে কেন? চিবুকের গড়ন অবিকল ছোটমামার মত। মাঝবয়েসী। এক জন ভদ্রলোক। টেলিফোনে গলা শুনে কমবয়েসী মনে হয়েছিল। রেবেকা ভেবেছিল ইউনিভার্সিটির কোনো ছাত্র। কিন্তু এর বয়স খুব কম হলেও চল্লিশ। জুলপির কাছের চুল সাদা হয়ে আছে। লোকটি মূর্তির মত বসে আছে। বেশ কয়েক বার রেবেকার চোখে তার চোখ পড়ল, কিন্তু লোকটি যেমন বসে ছিল, তেমনি বসে আছে। যেন এ জগতের কোনো কিছুর সঙ্গে তার কোনো যোগ নেই। কোথায় যেন সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসী একটা ভাব আছে এর মধ্যে।

পাশা হঠাৎ লক্ষ করল, মেয়েটি জেগে উঠেছে। অস্বস্তির সঙ্গে তাকাচ্ছে তার দিকে। পাশা এগিয়ে গেল। হাসিমুখে বলল, অনেকক্ষণ হল এসেছি। তুমি ঘুমাচ্ছিলে দেখে ডাকি নি।

রেবেকা কী বলবে ভেবে পেল না। প্রায় ছ ফুটের মতো লম্বা, অত্যন্ত সুপুরুষ এক জন অচেনা মানুষ তার সঙ্গে চেনা ভঙ্গিতে কথা বলছে।

পাশা বলল, চল যাই।

কোথায় যাব?

প্রথমে আমার বাসায় চল। রাত কাটে নি এখনো। এ সময় তো কাউকে পাওয়া যাবে না। ভোরবেলা খোঁজখবর করব। তোমার সুটকেসের পাত্তা পাওয়া গেছে?

না।

কোথাও মিসপ্লেসড হয়েছে, পরে খোঁজ নেব। চল যাওয়া যাক। খুব নাকি কাঁদছিলে তুমি?

লোকটি হাসছে মিটিমিটি। যেন সে রেবেকার কোনো গোপন দুষ্টুমি ধরে ফেলেছে। কথা বলছে তুমি-তুমি করে। কিন্তু তার জন্যে খারাপ লাগছে না মোটও।

নাও, এই কম্বলটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নাও। বাইরে ভীষণ ঠাণ্ডা।

রেবেকা ক্ষীণ স্বরে বলল, বরফ পড়ছে নাকি?

না, পড়ছে না। তবে চারদিকে প্রচুর বরফ আছে। বরফ দেখার শখ তোমার মিটে যাবে।

বাইরে বেরুতেই ঠাণ্ডা হাওয়ার একটা ঝাপটা লাগল। কী প্রচণ্ড শীত। পায়ের নিচে আয়নার মত মসৃণ কঠিন বরফ। পা বারবার পিছলে যাচ্ছে। পাশা বলল, বরফের ওপর হাটতে হবে খুব সাবধানে। প্রচুর আমেরিকান বরফে পিছলে পা ভাঙে, কাজেই আমাদের অবস্থা বুঝতেই পারছ। প্রথম ফেলবে পায়ের গোড়ালি এবং লম্বা স্টেপ নেবে না। ছোট ছোট পা ফেলবে। নাও, আমার হাত ধর।

রেবেকা হাত ধরল।

এটা কি ঠিক হচ্ছে? অজানা-অচেনা এক জন মানুষের হাত ধরেছে। কিন্তু খারাপ লাগছে না তো! নাসিম শুনলে কি রাগ করবে? নিশ্চয়ই করবে। পুরুষমানুষেরা খুব জেলাস হয়।

রেবেকা।

জ্বি।

প্রথম কিছু দিন হাইহিল পরবে না। আগে বরফে হাঁটার অভ্যেস হোক, তারপর। তোমার হিল পরার দরকারই-বা কী, তুমি তো যথেষ্ট লম্বা।

ক্লাসের মেয়েরা আমাকে কী বলে ক্ষেপাত, জানেন?

না।

ওরা আমাকে দেখলেই বলত–ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গ.. পাশা শব্দ করে হাসল। বেশ রসিক মেয়ে।

গাড়ি ছুটছে প্রচণ্ড বেগে। রেবেকা চুপচাপ বসে আছে। প্ৰচণ্ড অনিশ্চয়তার যে মেঘ তাকে ঘিরে ছিল, তা কেটে যেতে শুরু করেছে। কোথাও যেন একটি নির্ভরতার ব্যাপার আছে। রেবেকার চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। গাড়ির ভেতর আরামদায়ক উষ্ণতা।

রেবেকার জেগে থাকতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু জেগে থাকতে পারছে না। বারবার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ভদ্রলোক সিগারেট ধরিয়েছেন। গাড়ির কাঁচ ওঠান। সিগারেটের ধোঁয়ায় বমি এসে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে নিশ্চয়ই বলা যাবে না–সিগারেট ফেলে দিন। নাসিমেরও এ রকম অভ্যাস। ঠিক ঘুমাতে যাবার আগে মশারির ভেতর ঢুকে একটা সিগারেট টানবে। সেই কড়া গন্ধ মশারির ভেতর আটকে থাকবে সারা রাত। অভ্যাসটা প্রায় কাটিয়ে এনেছিল, এখন সে নিশ্চয়ই আবার শুরু করবে এবং এক দিন বিছানায় আগুনাগুন লাগিয়ে একটা কাণ্ড করবে। রেবেকা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।

Facebook Comment

You May Also Like