মাদল বাজাতে (অরণ্যের দিনরাত্রি-১০) – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

অরণ্যের দিনরাত্রি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মেয়ে-পুরুষের একটা দল মাদল বাজাতে বাজাতে হাট ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, কিছু না ভেবেই রবি তাদের সঙ্গ নেয়। ওরা কিছু বলেনি, তোয়ালে-সার্ট আর সাদা প্যান্ট পরা একটি লম্বা শক্ত চেহারার বাবু ওদের সঙ্গে আসছে, তবু ওরা কিছু বলেনি। ঢ্যাং-ট্যাং করে অকারণে মাদল বাজাচ্ছিল একটা বুড়ো, দু’তিনজন নাচের ভঙ্গিতে দুলছিল, ওরা হাঁড়িয়া খেয়ে নেশা করেছে। মাইল দেড়েক সেই রকম যাবার পর একটা গ্রামের সীমানায় পৌঁছুলো।

এদের সঙ্গে আসবার আগে রবি কিছুই চিন্তা করেনি। হাট দেখে সে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল, ঘুরতে ভালো লাগছিল না। শেখর যখন জুয়া খেলায় মাতলো, সে তখন একটু সরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছিল। হঠাৎ মাদলের আওয়াজ শুনে ফিরে তাকায়। বুড়োটা নেশার ঘোরে ঝুঁকে ঝুঁকে পড়ছে, মাদলের ভারও যেন সইতে পারছে না, কিন্তু সরু সরু আঙুলে বোল খুলছে স্পষ্ট—পিড়কা পিটাং পিড়কা পিটাং পিড়কা পিটাং। সেই বাজনার মধ্যে এমন একটা অপূর্ব দোলানি—রবির শরীরেও লেগেছিল সেই দোলা। পায়ে পায়ে রবি সেদিকে এগিয়ে এসেছিল, তার শরীরটাও দুলতে শুরু করেছে ততক্ষণে সেই মাদলের তালে তালে। বুড়োটার পিছন পিছন চলেছে একটা ছোটখাটো শোভাযাত্রা। জন দশ-বারো মেয়ে-পুরুষ, কয়েকটা বাচ্চাও। রবির তখন মনে হয়েছিল, তার বন্ধুদের চেয়েও এদের সঙ্গেই তার যোগ বেশি। সে ওদেরই একজন হতে চায়। কোনো দ্বিধা না করে রবি ওদের দলে মিশে নাচতে শুরু করেছিল। কয়েকজন ফিরে তাকিয়েছে, মেয়েরা মুচকি হেসেছে, কিন্তু কেউ আপত্তি করেনি। আরও দু’চারজন সাঁওতাল ওরাওঁ মেয়ে-পুরুষ মাঝপথে যোগ দিলো ঐ দলে। যেন একটা নদী চলেছে, যেখান থেকে জল এসে মেশে মিশুক।

মাঠের আলপথ ধরে নাচতে নাচতে এগিয়েছিল দলটা। কতদূর যাবে রবি কিছু ঠিক করেনি। একটু পরে কালকের সেই মেয়েটাকে দেখেছিল সে।

গ্রামের প্রথম বাড়িটার ঝকঝকে মাটির দাওয়া, উঠোনে কয়েকটা খাটিয়া বিছানো, একটা চকচকে চেহারার কচি আমগাছ ঠিক মাঝ উঠোন ফুঁড়ে বেরিয়েছে। একপাশের ঘরে ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে একটা বুড়ি। সেই মাদল বাজানো বুড়োটা একটা খাটিয়ায় বসে বললো, এ বিটিয়া, দু’আনার হাঁড়িয়া—রসা মিলবেক?

গৃহস্থ বাড়ি হলেও সেখানে হাঁড়িয়া চোলাই হয়, গাঁয়ের মানুষ বাড়ি ফেরার মুখে যার যা ইচ্ছে খেয়ে যায়। আশ্চর্য ব্যাপার, এই যে দলটি এলো—এরা সবাই সবাইয়ের আত্মীয় বা চেনা নয়, স্রেফ এক সঙ্গে জুটেছে ঐ মাদল বাজনার ছন্দের আকর্ষণে। সঞ্জয় ঠিকই বলেছিল, সাঁওতালদের জীবনযাত্রা অনেকটা সভ্য আমেরিকানদেরই মতন, মেয়ে-পুরুষ একসঙ্গে মিলছে খোলাখুলি, নাচছে, মদ খাচ্ছে। কোথাও কোনো আড়ষ্টতা নেই। নীল-পাড় শাড়ি পরা মেয়েটিকে রবি আগে থেকেই চোখে চোখে রেখেছিল, এবার একটা খাটিয়ায় সেই মেয়েটির পাশে গিয়ে বসলো, বললো, আমাকেও দু’ আনার হাঁড়িয়া! তারপর সেই মেয়েটির দিকে ফিরে বললো, তুই খাবি?

মেয়েটি অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বললো, তু তো কাল হামাকে ফিরায়ে দিছিলি।

কথাটা শুনেই খুব কষ্ট হলো রবির। শেখরের ওপর রাগ হলো। কাল এই মেয়েটা আরও দুটি মেয়ের সঙ্গে ওদের বাংলোয় কাজ চাইতে গিয়েছিল, ওরা ফিরিয়ে দিয়েছে। এই রকম মেয়েকে কেউ ফিরিয়ে দেয়? বরং ওদের ধন্য হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এই মেয়ে—এর শরীরের মতন মনও স্পষ্ট, এর ক্ষুধা স্পষ্ট, দাবী স্পষ্ট, অভিমান স্পষ্ট। রবি তো এই রকম সরলতার জন্যই উন্মুখ হয়েছিল। রবি মেয়েটির দিকে গভীর ভাবে তাকালো।

—আজ আর ফেরাবো না। তোর স্বামী কোন্‌জন?

মেয়েটি খিলখিল করে হেসে সুর করে বললো, উ তো কবে মরে গেছে। এতদিনে কুথায় আবার খোকা হয়ে জন্মালো!

আধঘণ্টার মধ্যে রবি জমিয়ে নিলো আসর। পকেট থেকে সে ফরফর করে একটার পর একটা নোট বার করতে লাগলো, সবাইকে হাঁড়িয়া খাওয়ালো। বেশি নয়, মাত্র সাত টাকা খরচ করতেই সে বাড়ির সমস্ত হাঁড়িয়া—মদ শেষ হয়ে গেল। দলসুদ্ধ সকলেই তখন টং। নুন-লাগানো সেদ্ধ ছোলা আর কাঁচা লংকা খেয়ে খেয়ে পেট ভরে গেল। রবির অসম্ভব ভালো লাগছে, সে জামাটা খুলে মাথায় পাগড়ির মতন বেঁধে ওদের সঙ্গে হৈ হৈ করে নাচতে লাগলো। যেন শব্দ শুনতে পাচ্ছে রবি, পট পট করে ওর এক-একটা বাঁধন ছিঁড়ে যাচ্ছে। কলকাতা, তপতী, অফিস, বাবা-মা—সব ছিঁড়ে যাচ্ছে! আদিম, বনবাসী মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছে সে এখন। ক্রিকেট খেলার মাঠেও রবি এতটা সাবলীল কোনোদিন হয়নি। ডান পায়ে একটু খোঁড়াচ্ছে, কিন্তু তবু নাচের তালে তালে পা মেলাতে অসুবিধে হচ্ছে না তার। গানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছে, ‘কোকিলা বাসা খুঁজে বাসা নাই, কাউয়োর বাসা আছে ছেনা নাই, কাউয়ো কোকিলায় বিয়া হব্যে এ—’

ক্রমশ ভিড় বাড়ছে। হাট-ফেরত নারী-পুরুষ যাবার পথে এ বাড়ির নাচ-গান শুনে আকৃষ্ট হয়ে এসে যে-যার হাতের সওদা নামিয়ে রেখে ভিড়ে যাচ্ছে দলের মধ্যে। কার বাড়ি, কে-কার চেনা এসবের কোনো বালাই নেই। নাচ-গান হচ্ছে তো—সেই তো যথেষ্ট নেমন্তন্ন। এরকম অবিমিশ্র আনন্দের স্বাদ রবি কখনো পায়নি।

সেই বুড়োটার ক্ষমতা অসাধারণ। এতক্ষণ ধরে মদ খেয়ে যাচ্ছে, নেশায় শরীর টলমল, নাচের ঝোঁকে দু’একবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে—কিন্তু মাদলের বোল নির্ভুল স্পষ্ট। উঠোন ভর্তি এক রাশ মুর্গী ছাগল, সেগুলোও পায়ে পায়ে ঘুরছে।

খানিকটা বাদে ঐ ভিড়ের মধ্যে রবি দেখতে পেলো লখাকে। পুরোনো কথা যেন সব কিছুই ভুলে গেছে রবি। কাল যে লখাকে মেরেছে, সে কথাও মনে নেই। হাঁড়িয়ার নেশা রবিকে পেয়ে বসেছে—সে লখাকে ডেকে হুকুম করলো, এই লখা, এখানে হাঁড়িয়া ফুরিয়ে গেছে। এই নে টাকা, যেখান থেকে পারিস হাঁড়িয়া নিয়ে আয়।

খানিকটা বাদে রবি উঠোন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মেয়েটা এসে বললল, কোথায় যেছিস?

রবির কোনো দ্বিধা হলো না, গলা একটু কাঁপলো না, স্পষ্ট ভাবে বললো, দাঁড়া, পেচ্ছাপ করে আসছি।

মেয়েটারও কোনো দ্বিধা নেই, সে বললো, চল, তোকে জাগা দেখায়ে দিচ্ছি, সাপ-খোপ আছে না জংলায়!

মেয়েটা ওকে নিয়ে এলো, বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে, মাঠের মধ্যে একটা মোটা গাছের গুঁড়ি ফেলা, সেই জায়গাটা দেখালো। মেয়েটা কাছেই দাঁড়িয়ে রইলো, যেন এর মধ্যে কোনোই অস্বাভাবিকতা নেই।

রবি জিজ্ঞেস করলো, তোর নাম কি?

—দুলি! আর তুহার নাম তো রবি-ই?

—তুই কি করে জানলি?

—কাল ঐ যে রাগী পাগলা বাবুটো রবিই রবিই বুলাচ্ছিল!

রবি হয়তো এক পলক শেখরের মুখটা দেখতে পেলো। হেসে বললো, হ্যাঁ, ঐ রাগী বাবুটা সত্যিই পাগলা। আচ্ছা, দুলি, তুই কাল আমাদের বাংলোয় গিয়েছিলি কেন?

—কাম ঢুঁড়তে। কাম মিলে না পাঁচ বোজ…তোর মত একটা পাতলা বাবু একবার আমাকে বলেছিল কলকাত্তা নিয়ে যাবে। বাবুটো আর এলো না—বেমারই হলো, না মরে গেল!

—তুই কলকাতায় যেতে চাস্ কেন? —কলকাতায় কত কাম মেলে, আর সাল ফুলমণি গেল, আখন সে তো লাল বেলাউজ কিনছে, খুঁপার জাল কিনছে।

কলকাতা আর কলকাতা! এদিকে সবারই মুখে কলকাতা একটা ম্যাজিক শব্দ। কলকাতায় সব সমস্যার সমাধান, কলকাতায় গেলেই চাকরি! রবি বিরক্তভাবে হাসলো। এখান থেকে তো টাটানগর কাছে, কাজ পাবার সম্ভাবনা সেখানেই বেশি, তবু কলকাতা এত মোহময়। কলকাতায় রাজমিস্ত্রীদের কাজে যোগান দেবার জন্য কিছু কিছু আদিবাসী মেয়েদের সে দেখেছে। কিংবা রাস্তা বানানোর কাজে। ছাপা শাড়ি উঁচু করে পরা, অনেক সময় পিঠে বোঁচকা-বাঁধা শিশু। হ্যাঁ, লাল ব্লাউজ পরে তারা, মাথার খোঁপায় জাল পরতেও পারে। তার জন্য দাম দিতে হয়, চামড়া খসখসে হয়ে আসে, চোখ শুকিয়ে যায়—কলকাতার হাওয়া এরকম।

এই মেয়েটা ধলভূমগড়ের বাজারে পাঁচদিন বসে থেকেও কোনো কাজ পায় না—ব্লাউজ কেনার সামর্থ্য হয়নি, পেটে ভাতও জোটে না রোজ, তবু এরকম মসৃণ ভরাট শরীর কি করে পায় কে জানে! মাঠভর্তি চাঁদের আলো নেমেছে, সেই আলো পিছলে যাচ্ছে মেয়েটার শরীরে। রবি বললো, আমরা আর ওখানে ফিরে যাবো না, চল মাঠের মধ্যে গিয়ে তুই আর আমি বসি।

মেয়েটার চোখ চকচক করে উঠলো। যেন সে ধন্য হয়ে গেল। তার জীবন সার্থক, কত তো মেয়ে ছিল, কিন্তু শুধু তাকেই কলকাতার ফর্সাবাবুটা দয়া করেছে, আলাদা তার সঙ্গে বসতে চেয়েছে। ধন্য তার জীবন। সে উঠে এসে সরাসরি রবির হাতটা ধরলো, পাখির বাসার মতন গরম তার হাত। সে পরম অনুনয় ভরা গলায় বলল, আমায় টাকা দিবি? আমি খুপার জাল কিনবো, একটো লাল বেলাউজ কিনবো।

রবির মনে হলো, এই তো সবচেয়ে সরল ও স্বাভাবিক—ওর নেই, ও চাইছে, রবির আছে, রবি দেবে। যে দেবে, সে তার বদলেও কিছু নেবে। সবারই ভিন্ন ভিন্ন রকম দেবার জিনিস আছে। অথচ, তপতীর জন্য সে…। রবি পকেটে হাত ভরে যা ছিল সব তুলে আনলো। মাত্র চোদ্দটা টাকা ছিল, সব তার হাতে গুঁজে দিতেই দুলি অসম্ভব রকম উৎফুল্ল হয়ে উঠলো, রবির শরীরের সঙ্গে নিজের দেহ লেপটে আদুরে গলায় বললো, বাবু, তুই রাজা হবি।

রবি হাত দিয়ে দুলির হাত বেষ্টন করলো। একটা হাত দুলির বুকে রেখে আর এক হাত ওর মুখ বুলোতে লাগলো। নরম মসৃণ চামড়া ভিজে-ভিজে গরম, সারা শরীরটা কাঁপছে।

দুলি ফিসফিস করে বললো, চল।

মাঠ পেরিয়ে ওরা আবার বনের মধ্যে ঢুকলো। অন্ধকারে রবি কিছু দেখতে পায় না, শুধু অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দুলির শরীরটাই তার কাছে স্পষ্ট। দুলির সব কিছু চেনা, অরণ্যের প্রতিটি গাছের মাঝখানের ফাঁকটুকুও যেন তার মুখস্থ। শিশুর হাত ধরে যেমন অন্ধ বৃদ্ধ যায়, সেই রকম, রবি বুঝতে পেরেছিল, দুলির ছটফটে পায়রার মতন শরীরটা ছুঁয়ে থেকেই সে ঠিক জায়গায় পৌছে যাবে। কোন সংক্ষিপ্ত রাস্তা দিয়ে দুলি সেই ভাঙা মিলিটারি ব্যারাকে গিয়ে পৌঁছোলো।

গতকালের এঁটো শালপাতাগুলো সেখানে তখনো পড়ে আছে। ইঁট পাতা উনুনের ওপর কালো হাঁড়ি। কাল মেয়ে তিনটে এখানে ধুঁধুল সেদ্ধ আর ভাত খেয়ে পেটের জ্বালা মিটিয়েছে। আজ তাদের মধ্যে দুলি একা এখানে এসেছে এক রাজপুত্রের হাত ধরে। রেলগুদামের বাবু হারাধনবাবুর বাড়িতে বাগানের আগাছা পরিষ্কারের কাজ করতে গিয়েছিল দুলি, বাবুর ভাইপো তার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিল—কি কথায় একবার যেন তার হাত ধরেছিল। বাবু দেখতে পেয়ে নিজের লোককে কিছু বলেনি, দুলির নাকের ওপর একটা থাপ্পড় মেরে টেনে ফেলে দিয়েছিল। তার নিজের মরদটা যতদিন বেঁচে ছিল সেও তাকে মারতো। মার খেয়েছে ঠিকাদারের কাছে, রাজমিস্ত্রীর কাছে। যারা টাকা দিয়ে কাজ করায়, তারা মাঝে মাঝে মারবে, গালাগালি দেবে, একটু দোষ পেলেই টাকা কেটে নেবে—এসব তার কাছে স্বাভাবিক। শুধু আজ এই একটা বাবু—সব বাবুর সেরা বাবু—যত্ন করে হাত রেখেছে তার কোমরে, কী আদর করে ফিসফিস করে কথা বলছে কানে কানে!

দুলির কোনো লজ্জা নেই। পা দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে সে রবির হাত ধরে টেনে তাকে বসালো মাটিতে। তারপর রবির সেই হাতখানা সে তার বুকের ওপর রাখলো। নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলো রবির দিকে। কত কথা বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু সে কোনো কথা জানে না। সব কথা একসঙ্গে বলার একমাত্র ভাষায় সে আপন মনে হেসে উঠলো।

এই রাত তার জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত। সে কাজ পায় না, তার স্বামী নেই, সে একটা সামান্য হতভাগ্য প্রাণী, আর এই সুন্দরপানা বাবুটা এত লোক থাকতে, তাকেই আদর করছে, তার এই সামান্য শরীরটাকে নিয়ে কত খেলা করছে, এত সৌভাগ্য সে কোনোদিন ভাবতে পেরেছিল? ফুলমণির চেয়েও আজ সে বেশি সৌভাগ্যবতী। এক কথায় বাবুটা তাকে দশ টাকা আর চার টাকা দিয়ে দিলো, ঐ টাকার বদলে সে কত কাজ করে দিতে রাজী ছিল, সে এ জন্য কুঁয়া থেকে পাঁচশো বালতি জল তুলে দিতে পারতো, সাতদিন ঝাঁক ঝাঁকা ইঁট বইতে পারতো, বাবুটা সে সব কিছু চায় না, বরং বাবুটা উল্টে তাকে কত আদর করছে।

রবিও কোনো কথা বলছে না। দুলির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত বুলোতে বুলোতে সে এক ধরনের শিহরণ বোধ করছে ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার বুকে এসে জমা হচ্ছে রাগ আর অভিমান। সাতাশ বছর বয়েস—এর আগে রবি কখনো কোনো মেয়েকে এমনভাবে স্পর্শ করেনি। অনেক মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার, অনেক মেয়ে তাকে অন্তরঙ্গতার ইঙ্গিত দিয়েছে—কিন্তু রবি তপস্বীর মতন নিজেকে পবিত্র রেখেছিল শুধু একজনের জন্য। তপতী সান্যাল, নিউ আলিপুরে, রবির হাতে হাত রেখে বলেছিল…তপতীর মুখখানা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠলো, রক্তবর্ণের ঠোঁট, দেবী-দুর্লভ দুটি টানাটানা চোখ—এই তপতীকেই রবি একদিন দেখেছিল…। অসহ্য রাগে রবির বুক গুমরে উঠলো, সে সবকিছু ভেঙে ফেলবে, লণ্ডভণ্ড করে দেবে। একটা চাপা আওয়াজ করে রবি পাগলা পশুর মতন দুলির বাহু কামড়ে ধরলো। ভয় পেয়ে দুলি চিৎকার করে উঠতেই রবির সংবিৎ ফিরে এলো। তাড়াতাড়ি বললো, না, তোকে না, তোকে না, তুই খুব ভালো, তোকে আমি খুব ভালোবাসবো।

মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো রবি, দুলিকেও পাশে শোয়ালো নিজের হাতের ওপর। মাথার ওপর জ্যোৎস্না-ধোয়া নীল আকাশ, তাতে অসংখ্য তারা। এত বেশি তারা কলকাতার বাইরের আকাশেই দেখা যায়। কোমরবন্ধে তলোয়ার ঝুলিয়ে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে কালপুরুষ। রবি বললো, তুমি দেখো।

শাড়িটা খুলে ফেলেছে দুলি, আনন্দে উঁ—উঁ শব্দ করছে। অন্ধকারে মিশে আছে ওর কালো দৃঢ় শরীর। রবি ওর বুকে আঙুল রেখেছে, কোমর বেষ্টন করে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। দুলির মুখে রসুন-রসুন গন্ধ, চুলে বাসি জলের গন্ধ, শরীরে শ্যাওলার গন্ধ। দুলির ঠোঁট বড় বেশি নোনতা, বুক নোনতা।

এ সব গন্ধ আর স্বাদ যে খুব মনোরম তা নয়। কিন্তু, এতকাল মেয়েদের কাছে এলেই রবি পেয়েছে শুধু শ্যাম্পুর গন্ধ, সাবানের গন্ধ, পাউডারের গন্ধ, স্নো’র গন্ধ—সেই সব গন্ধ প্রত্যেকটি রুচিশীল। কিন্তু এই রকম একটি প্রাকৃতিক সরলতার জন্য যে রবির মন এমন উন্মুখ হয়েছিল—রবি তা নিজেই জানতো না। চিরকাল কলকাতা শহরে মানুষ—কোনোদিন গ্রামে থাকেনি, কোনোদিন খালি পায়ে হাঁটেনি, নাগরিক গন্ধ, নাগরিক হওয়ায় সে চিরকাল অভ্যস্ত। কিন্তু আজ এই মাটিতে শুয়ে থাকা তার কাছে মনে হচ্ছে কত স্বাভাবিক, যেন কতকাল এইরকম জঙ্গলে শুয়ে থেকেছে সে। যে-কোনো নারীকে পাশে শোবার জন্য ডেকেছে। জঙ্গলের জীবনই মানুষের রক্তে এখনো মিশে আছে, একটুও ভুলতে পারেনি।

পাগলের মতন ছটফট করতে লাগলো রবি, দুলির গায়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে এক সময় সে তার সম্পূর্ণ শরীরটাকে নিজের শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। মেয়েটার শরীরে যেন কোনো হাড় নেই, চামড়া দিয়ে আগুনের হলকা বেরুচ্ছে, উরু দিয়ে প্রবলভাবে চেপে ধরেছে রবিকে, রবি অশ্রান্তভাবে বলতে লাগলো, তুই খুব ভালো, তুই খুব ভালো—আমি তোকেই এতদিন চেয়েছিলাম, আর কাউকেই চাই না! তার নিঃশ্বাস এত ঘন ঘন যেন দম আটকে আসবে। রবির শুকনো, দগ্ধ বুকের মধ্যে যেন এতদিনে একটা সত্যিকারের নরম হাতের ছোঁয়া।

খানিকক্ষণ পর, মাটিতে চিৎ হয়ে পাশাপাশি শুয়ে রইলো ওরা। চাঁদ এখন এসে পড়েছে মাথার ওপর, ঠিকরে পড়ছে জ্যোৎস্না, রোদ্দুর আড়াল করার মতই রবি চোখের সামনে হাত দিয়ে জ্যোৎস্না আড়াল করছে। ওর শরীরের ওপর রাখা দুলির একটা ঠাণ্ডা হাত। রাত এখন কত তার ঠিক নেই। রবির তখন কিছুই মনে পড়ছে না, কলকাতা নয়, বাংলোর বন্ধুরা নয়, শুধু চোখের সামনে একটা জ্যোৎস্না আড়াল করা হাত।

দুলি রবিকে একটা ঠেলা দিয়ে বললো, বাবু, তুই আমায় কলকাতা নিয়ে যাবি?

রবি বললো, না।

—নিয়ে যাবি না?

—না, কলকাতা ভালো না।

—তুই চলে যাবি?

—না, যাবো না। আমি এখানেই থাকবো! কথাটা শুনে দুলির কি মনে হল কে জনে, সে ধড়মড় করে উঠে কনুইতে ভর দিয়ে রবির মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। তারপর একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে সাধারণ গলায় বললো—যাঃ, ঝুট বাত্‌! তুই কেন এখানে থাকবি? তুই কলকাতায় কত ভারী ভারী কাম করবি, পয়সা কামাবি—ইখানে এ জঙ্গলে কি আছে?

রবি হাত দিয়ে তার মুখ চাপা দিয়ে বললো—থাক, চুপ কর। এখন কলকাতার কথা আমার মনে করতে ইচ্ছে করছে না।

খানিকটা বাদে রবির সব মনে পড়লো, খেয়াল হলো বাংলোয় ফেরার কথা। উঠে পোশাক পরে বললো, চল দুলি, আমায় রাস্তা দেখিয়ে দিবি! দুলি তখনো উঠতে চায় না, তার ইচ্ছে সারারাত ওখানেই থাকে। এত আনন্দ—তার জীবনে আর কখনো কি আসবে? এখুনি সে শেষ করতে চায় না।

কিন্তু দুলি তবু উঠে পড়লো।

সামনেই সেই পাকা রাস্তা, রাস্তা পেরিয়ে ওপারে জঙ্গলে আবার ঢুকলো। মাঝে মাঝে এখানে ওখানে জঙ্গলে শুকনো পাতা ভাঙার আওয়াজ। যেন অলৌকিক মুহূর্তে অশরীরিরা জঙ্গলে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দুলি তখনো রবির শরীরের সঙ্গে লেগে আছে, মাঝে মাঝে বড় বড় আরামের নিঃশ্বাস ফেলছে। রবি সিগারেট ধরালো।

একটু বাদেই সামনে কয়েকটি অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি চোখে পড়লো। রবি বুঝতে পারলো, তার বন্ধুরা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। রবি চেঁচিয়ে উঠলো, শেখর? আমি এখানে—

ওপাশ থেকে কোনো সাড়া এলো না। পায়ের শব্দ থেমে গেল। রবি আবার বললো, শেখর? কে?

এবার ওদিক থেকে উত্তর এলো, উই সেই হারামি বাবুটা!

গলার আওয়াজ শুনেই রবি চিনতে পারলো। দুলি ভয়ে কেঁপে উঠলো, তার রাজকুমারের এবার বিপদ! অন্ধকার থেকে জ্যোৎস্নার নিচে এগিয়ে এলো চারটে ছায়ামূর্তি, প্রত্যেকের হাতে লাঠি, তার মধ্যে একজন লখা। আর একজন প্যান্ট-সার্ট পরা সাঁওতাল, স্পষ্টতই সে কোনো সাহেবের বাড়ির খানসামা কিংবা সহিস ছিল, কিংবা মিশনারিদের কাছে লেখাপড়া শিখেছে, কেননা, সে বৃটিশ উচ্চারণে বলে উঠলো, ইউ বাস্টার্ড, ইউ সান অব এ বীচ—ইউ থিংক সানথাল গার্লস আর ফ্রি—

রবি গর্জন করে উঠলো, কে রে? কে তুই?

আর কিছু বলার আগেই একটা লাঠির ঘা লাগলো রবির আহত পায়ে। দুলি কঁকিয়ে উঠলো ভয়ে। একজন এসে দুলির মুখ চাপা দিলো। রবি আহত নেকড়ের মতন শূন্যে লাফিয়ে উঠে, দাঁতে দাঁত ঘষে বললো, হারামজাদা!

সে লখার টুঁটি চেপে ধরতে গেল। লখা এক ঝটকা দিয়ে ওকে ফেলে দিতেই আরেকজন আবার লাঠির ঘা কষালো। আঘাতটা লাগলো রবির ঘাড়ে। এক মুহূর্তের জন্য চোখে অন্ধকার দেখে রবি মাথা ঘুরে পড়ে গেল মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে কয়েক পাক গড়িয়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালো। এখন সে ছুটে পালাতে পারে—তার এক পায়ে ব্যথা হলেও তার সঙ্গে ছুটে কেউ পারবে না।

কিন্তু রবির সে কথা মনেই পড়লো না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সমস্ত পৃথিবীর ওপর দারুণ ঘৃণায় সে থুঃ করে থুতু ফেললো। ওদের মধ্যে একজন দুলির হাত দুটো পিছমোড়া করে শক্ত ভাবে ধরে আছে, অন্য হাতে দুলির মুখ চাপা দেওয়া। বাকি তিনজন রবিকে আবার আক্রমণ করার জন্য উদ্যত। রবির সমস্ত শিরা-উপশিরা সজাগ হয়ে উঠলো, অন্যদের ছেড়ে সে লখার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকালো। প্যান্ট পরা লোকটি লাঠি তুলতেই রবি তাকে বিদ্যুৎগতিতে পাশ কাটিয়ে গেল, দাঁতে দাঁত চেপে ‘হারামজাদা’ বলে সে লাফিয়ে গিয়ে ধরলো লখার ঘাড়। মুহূর্তের মধ্যে তাকে ঘুরিয়ে সামনের দিকে এনে নাকের পাশে মারলো একটা প্রবল ঘুঁষি। হাতের মুঠোটা তার তক্ষুনি রক্তে ভিজে গেল। লখারও গায়ের জোর কম নয়, রবির ওরকম ঘুঁষি খেয়েও সে অজ্ঞান হলো না, দুর্বোধ্য ভাষায় কি যেন চিৎকার করে সে সাঁড়াশীর মতন শক্ত হাতে রবির গলা চেপে ধরতে গেল। রবি জুডার কায়দায় হাঁটু তুলে মারলো লখার চিবুকে। কিন্তু আর সরে যাবার সময় পেলো না বাকি দুজন তাকে জাপটে ধরলো পেছন থেকে। একটা গাছের সঙ্গে ঠেসে ধরলো।

প্যান্ট পরা লোকটা এগিয়ে এসে ঠাস করে রবির গালে একটা থাপ্পড় কষিয়ে বললো, হারামির বাচ্চা! কলকাতা থেকে এখানে ফুর্তি করতে এসেছো? এই জঙ্গলের মধ্যে পুঁতে ফেলবো আজ!

রবির নড়ার ক্ষমতা নেই। চোখ দুটো স্থির করে তাকিয়ে রইলো। তক্ষুনি এই গোটা পৃথিবীটা ধ্বংস করার ইচ্ছে হলো তার। সে শক্তিও তার আছে, অনুভব করলো। লখা নিজের চোয়াল থেকে রক্ত মুছতে মুছতে রক্তমাখা থুতু ছিটিয়ে দিলো রবির মুখে। ওদের মধ্যে বাকি লোকটা একটু ভদ্র, সে হাত দিয়ে লখাকে সরিয়ে দিয়ে বললো, বাবু, আপনারা কি ভাবেন? চিরকাল এক জিনিস চলবে? যাকে তাকে ধরে মারবেন? আমাদের মেয়েদের কোনো ইজ্জত নেই? আমাদের মেয়েদের নিয়ে যা খুশী করবেন?

রবি গর্জন করে উঠলো, বেশ করবো! যে চোর, তাকে নিশ্চয়ই মারবো। মেয়ে আবার আমাদের তোমাদের কি? যাকে যার পছন্দ হবে—আমি কি ওকে জোর করে ধরে এনেছি?

দুলি এই সময় কোনোক্রমে হাত ছাড়িয়ে এসে আর্তগলায় বললো, বাবুকে ছেড়ে দে! ইটা ভালো বাবু! প্যান্ট-পরা লোকটা এক থাপ্পড় দিয়ে দুলির কথা থামিয়ে দিলো। রবিও নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো ঝটকা মেরে, তেড়ে এলো ঐ লোকটার দিকে। মাথায় লাঠির ঘা পড়ায় রবি ঘুরে দাঁড়িয়ে লাঠিটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করতে করতে এবার প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলো—শেখর! শেখর! সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রবল ঘুষি পড়লে তার মুখে। রবি টলে যেতেই আবার একটা লাঠির ঘা লাগলো তার শিরদাঁড়ায়, রবি মাটিতে পড়ে গেল, ধপাধপ করে জুতোসুদ্ধ লাথি এবং লাঠির ঘা পড়তে লাগলো তার শরীরে। রবির আর প্রতিরোধের ক্ষমতা নেই, অসহ্য যন্ত্রণায় আস্তে আস্তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার চেতনা হঠাৎ যেন পরিষ্কার হয়ে গেল, তার মনে হলো, এ লোকগুলো কেন তাকে মারছে? কেন সে শাস্তি পাচ্ছে? কিন্তু যাই হোক, আজ সে কোনো অন্যায় করেনি, কোনো পাপ করেনি, তার পূর্ব জীবনে যত অন্যায় সে করেছে আজ সেইজন্য সে শাস্তি পাচ্ছে। জ্ঞান হারাবার ঠিক আগে সে একটা শান্তির নিঃশ্বাস ফেললো। দুলির মুখে হাত চাপা দিয়ে তাকে ছেঁচড়ে টানতে টানতে নিয়ে সরে পড়লো সেই চার ছায়ামূর্তি।

Facebook Comment

You May Also Like