হাট দেখে নিরাশ (অরণ্যের দিনরাত্রি-৭) – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

অরণ্যের দিনরাত্রি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

হাট দেখে নিরাশ হতে হলো। গুচ্ছের মাটির হাঁড়িকুড়ি আর তরিতরকারির দোকান ছাড়া কিছুই নেই প্রায়। কিছু মুর্গী ছাগল এসেছে, গামছা আর ঝ্যালঝেলে শাড়ি-ধুতির কয়েকখানা দোকান, এক কোণে কয়েকটা নাপিত লাইন দিয়ে চুল কাটতে বসেছে। আর একদিকে ভাত-পচাই হাঁড়িয়ার মদ বেচছে কয়েকটা মেয়ে, ছুরি-কাঁচি শান দিচ্ছে একটা লোক—তার তীক্ষ আওয়াজ। তবু মানুষের অন্ত নেই, দূর দূর গ্রাম থেকে সকাল থেকেই এসেছে মেয়ে-পুরুষ, খেতে না-পাওয়া শীর্ণ চেহারার মিছিল।

ওরা ভেবেছিল, হাট হবে অনেকটা মেলার মতন, আনন্দ ফুর্তি হৈ-হল্লার এক বিকেল। তার বদলে শুধুই মানুষ আর বেগুন-পটলের ভিড়, এরা সবাই এসেছে অজানা অঞ্চলের মাঠ, জঙ্গল কিংবা টিলার প্রান্ত থেকে, শুধু হৃদয়হীন বিনিময়ের জন্য। বেঁচে থাকা, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার মতন একটা দারুণ শক্ত কাজে এরা সবাই বিষম ব্যস্ত।

আনন্দের ব্যবস্থা যে একেবারেই নেই তা নয়, ডুগডুগিতে ডিগ—ডিগ—ডিগ—ডিগ শব্দ তুলে বাঁদর নাচ দেখানো হচ্ছে এক জায়গায়, ছক্কা-পাঞ্জার জুয়ার বোর্ড পড়েছে গোটা তিনেক, হাঁড়িয়ার দোকানগুলোতেও ভিড় কম নয়।

রোদের তাপ উঠেছে চড়া হয়ে, ওরা চারজন অলস পায়ে ঘুরছে, ভালো লাগছে না ওদের, সঞ্জয় বললো—চল, কাল চলে যাই এ জায়গা থেকে। আর ভালো লাগছে না।

অসীম বললো, কেন, খারাপ কিসের—কলকাতাতেই বা এর চেয়ে কী এমন বেশি ভালো লাগে!

—কিন্তু আমরা এখানে এসেছিলুম চুপচাপ থাকতে। কিন্তু এখানেও সেই ভিড় আর গণ্ডগোল!

—তোর যদি ভিড় ভালো না লাগে তো তুই বাংলোয় গিয়ে শুয়ে থাক না!

সঞ্জয় বললো, ঠিক ভিড়ের জন্যও না। সব ব্যাপারটাই কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে। আদিবাসীদের মেলা অনেক কালারফুল হবে ভেবেছিলাম। কতগুলো কুষ্ঠরোগী এসেছে দ্যাখ! ওদের দিকে তাকালেই গা শিরশির করে।

শেখর বললো, তুই সব কিছুই দেখবি কেন? তোর পছন্দ মতন বেছে নে! লক্ষ্য করে দ্যাখ, এখানকার পুরুষগুলো সব রোগা-পটকা হলেও মেয়েগুলোর স্বাস্থ্য খারাপ নয়, তাকাতে খারাপ লাগে না। আমি শুধু মেয়েদেরই দেখছি!

সঞ্জয় শেখরের ইয়ার্কি গায়ে মাখলো না। বললো, একটা জিনিস তোর মনে হচ্ছে না? এদের মধ্যে আমরা যেন একেবারে বিদেশী। আমাদের পোশাক, চালচলন—এদের সঙ্গে কত তফাত—আমরা একই দেশের মানুষ, এ কথা বোঝার কোনো উপায় আছে? এ দেশে রেভোলিউশান কবে সম্ভব হবে? আমাদের কথা ওরা কোনোদিন শুনবে? কোনোদিন ওরা আমাদের বিশ্বাস করবে? আপন জন বলে ভাববে?

শেখর বললো, তুই একটা মধ্যবিত্ত, তোর কথা কে শুনবে? কেউ শুনবে না। বিপ্লব যদি কখনো হয়—তবে তার নেতা ওদের মধ্যে থেকেই জন্মাবে।

—কবে?

ভিড়ের মধ্যে লখাকে দেখতে পেয়ে শেখর ওকে ডেকে উঠলো। লখার সঙ্গে স্পষ্ট চোখাচোখি হতেও লখা সাড়া দিল না, চট করে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। অসীম হাসতে হাসতে বললো, ওর অভিমান হয়েছে! আসবে আবার ঠিক, কলকাতায় চাকরি দেবার লোভ দেখিয়েছি!

পরমেশ্বরের সঙ্গে অপর্ণা আর জয়াও এসেছে। ওরা চারজন তখন জুয়ার বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে, অসীম শেখরকে বলছিল, কি রে, খেলবি নাকি?

শেখর বলছিল, কী হবে খেলে, গরীব বেচারারা এক্ষুনি আমাদের কাছে হেরে সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে! এ খেলায় যার বেশি টাকা থাকে সেই জেতে, আমি কতবার দেখেছি? এদের সঙ্গে খেলতে ভালো লাগে না—।

অসীম বললো, যা, যা চাল মারিস না! তুই সব খেলাতেই জিতিস? খেলে দ্যাখ না?

শেখর হেসে পকেট থেকে ব্যাগ বার করলো। ফিস ফিস করে বললো, অসীম, তুই আমার জুয়া খেলা দেখিসনি। সুনীল আর অবিনাশের সঙ্গে বারীনদার আড্ডায় এক সময় কি তুলকালাম কাণ্ড করেছি, তুই তা জানিস না।

একটা লাল দু’টাকার নোট ছুঁড়ে দিয়ে শেখর বললো, ছড়িদার, রাখো, ওটা হরতনের ওপর রাখো!

যে-লোকটা বোর্ড পেতেছে, সে সম্ভ্রমের সুরে বললো, পুরা দু রূপিয়া, মালিক? এখানে সিকি-আধুলির বেশি কেউ খেলে না, সামর্থ্য নেই। শেখর ঘাড় হেলালো। টিনের কৌটোর মধ্যে একট বড় ছক্কা ঘটাং ঘটাং করে নেড়ে ওলটালো লোকটা। রুহিতন। শেখর হেরেছে। শেখরের মুখে কিন্তু তখনো টেপা হাসি। এবার একটা পাঁচ টাকার নোট ছুঁড়ে দিয়ে বললো, ফিন্‌ হরতন।

সেবারেও শেখরের হার। শেখর একটা দশ টাকার নোট রাখলো সেই হরতনেই। আবার হার। আবার হরতনে কুড়ি টাকা। সবাই উদগ্রীব হয়ে শেখরকে দেখছে। সেবার হরতন উঠলো, শেখর বললো, দাও হে, ছড়িদার, ষাট টাকা দাও! দেখলি অসীম, এ খেলাটা এতই সোজা।

সঞ্জয় বললো, থাক শেখর, টাকাটা তুই নিসনি। বেচারা গরীব লোক।

শেখর বললো, অত দয়ামায়া আমার নেই। জুয়ার টাকা আমি ছাড়ি না।

এমন সময় পেছন থেকে জয়া বলেছিল, একি, কতক্ষণ থেকে আপনাদের খুঁজছি!

ওরা পেছন ফিরে বললো, আমরাও তো তোমাদের খুঁজছি। রুণি, তোমার কাচের চুড়ি কেনা হয়েছে? হয়নি? চলো খুঁজে দেখি।

—আপনাদের আরেকজন কই?

ওরা তাকিয়ে দেখলো, রবি নেই। একটু আগেও ছিল। অসীম বললো, কিছু একটা কিনছে বোধহয়। এসে পড়বে এক্ষুনি!

অপর্ণা বললো, আমরা তো সব জায়গাই ঘুরে এলুম, ওঁকে কোথাও দেখলুম না তো!

—একটু আগেও তো ছিল আমাদের সঙ্গে। কিছু বলে যায়নি যখন, তখন কাছেই কোথাও গেছে। হয়তো—

—আপনারা ঐ ভিড়ের মধ্যে কি করছিলেন?

—জুয়া খেলছিলাম। শেখর অনেক টাকা জিতে নিয়েছে।

জুয়ার কথা শুনে জয়া একটু আঁতকে উঠলো। র্ভৎসনার চোখে শেখরকে দেখে বললো, ছি ছি, ঐসব লোকের মধ্যে বসে আপনারা জুয়া খেলছিলেন?

শেখর হাসতে হাসতে বললো, তাতে কি হয়েছে? জিততে বেশ লাগে। তুমি একটু খেলবে নাকি?

—মাগো! বলতে লজ্জা করলো না আপনার? হাটের মধ্যে বসে আমি জুয়া খেলবো—আর বাকি থাকবে কি?

অপর্ণা কিন্তু অত্যন্ত উৎসাহ পেয়ে গেল। উজ্জ্বলভাবে দাবি জানালো, আমি খেলব একটু! আমায় খেলাটা শিখিয়ে দিন। কত টাকা লাগবে?

দু’বোনের বদলে অপর্ণা আর জয়াকে দুই বন্ধু বলেই মনে হয় সব সময়। তার মধ্যে অপর্ণারই ব্যক্তিত্ব বেশি! এবার কিন্তু জয়া হঠাৎ দিদিগিরি ফলিয়ে ভারী গলায় বললো, না রুণি, ছেলেমানুষী করিস না।

—কেন, একটু খেলি, বেশি না।

—না। বাবা শুনলে রাগ করবেন।

দিদির কথার অবাধ্য হবে কি হবে না—এই রকম দ্বিধা অপর্ণার মুখে। সে আর কিছু বলার আগেই শেখর তার চোখে সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ে বললো, রুণির খুব শখ দেখছি। এই বয়েসেই জুয়া খেলায় এত ঝোঁক? থাক, খেলতে হবে না, চলো।

পায়ে পায়ে সম্পূর্ণ হাট টাই ঘোরা হয়ে যায় আবার। সঞ্জয় বার বার চোরা চাহনিতে দেখছে অপর্ণাকে। অনুরাধার সঙ্গে অপর্ণার সত্যিই দারুণ মিল। শুধু চেহারায় নয়, স্বভাবেও। অনুরাধা যদি এই মেলায় আসতো—তা হলে সেও নিশ্চয়ই জুয়া খেলতে চাইতো। হঠাৎ একটা কথা কল্পনা করে সঞ্জয়ের হাসি পেলো। মিঃ বিশ্বাস যদি কখনো দেখতে পেতেন, এই রকম একটা হাটে কতগুলো নোংরা আর জংলী লোকের সঙ্গে বসে তাঁর মেয়ে জুয়া খেলতে চাইছে—তা হলে তাঁর মুখের চেহারা কেমন হতো? মিঃ বিশ্বাস খুব স্পোর্টসের ভক্ত, জুয়া খেলাকেও তিনি কি স্পোর্টস হিসেবে নিতে পারতেন? কিংবা গেইম ফর রিলাক্সেশান? মিঃ বিশ্বাসের ওপর কোনো একটা প্রতিশোধ নেবার দারুণ ইচ্ছে হয় সঞ্জয়ের।

অসীম বার বার চেষ্টা করছে অপর্ণার পাশে পাশে হাঁটতে। অপর্ণা কখনো এদিক ওদিক চলে গেলে অসীম আবার স্থান বদলে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। অপর্ণার কৌতূহলের শেষ নেই। যে-কোনো ভিড় দেখলেই সে একবার উঁকি দেবে। এমনকি বাঁদর নাচও তার দাঁড়িয়ে দেখা চাই।

অনেক খুঁজে একটা পছন্দসই চুড়ির দোকান পাওয়া গেল। অন্যদের সরিয়ে ওরা সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। জয়ার হাত নরম—সহজেই সে হাতভর্তি চুড়ি পরে ফেললো, কিন্তু অপর্ণার হাত একটু শক্ত, অনভিজ্ঞ চুড়িওয়ালা অনবরত পরাতে গিয়ে ভাঙছে। অসীম তার পাশে বসে পড়ে বললো, ধ্যাৎ, দাও, আমি পরিয়ে দিচ্ছি।

অপর্ণা ভ্রূতঙ্গি করে বললো, আপনি চুড়ি পরাতেও পারেন বুঝি?

—পরাতে না পারি, ওর মত ভাঙতে তো পারবো! ভাঙছেই যখন, ওর বদলে আমিই ভাঙি।

—কিন্তু ও ভাঙলে পয়সা লাগবে না, আপনি ভাঙলে পয়সা দিতে হবে।

—হোক। তবু আমার কাঁচের চুড়ি ভাঙতে ভালো লাগে।

—আগে অনেক ভেঙেছেন বুঝি?

—হ্যাঁ, অনেক। মনে মনে।

অসীম অপর্ণার হাত নিজের করতলে তুলে নিলো, আঙুলগুলো লম্বা, লম্বা, নখগুলোতে গোলাপি আভা, দেখতে এত নরম হাত—তবু এত শক্ত কেন?

মুখ-টেপা হাসিতে অপর্ণা বললে, একি, অত জোরে চেপে ধরেছেন কেন? চুড়ির বদলে আমার হাতটাই ভাঙবেন দেখছি!

অনেক ভেবে-চিন্তে সঞ্জয় একটা রসিকতা করার চেষ্টা করলো, কি করবে, ওর তো পাণিগ্রহণ করার অভ্যেস নেই!

সে রসিকতায় কেউ হাসলো না। জয়া বললো, চুড়িওয়ালা হিসেবে অসীমবাবুকে কিন্তু বেশ মনিয়েছে!

অসীম বললো, রুণি, তুমি কী রঙের চুড়ি পরবে বলে?

—আপনিই পছন্দ করুন।

অপর্ণার শাড়ির পাড় হালকা সবুজ, কপালেও সবুজ টিপ পরেছে, সেগুলো এক পলক দেখে নিয়ে অসীম বললো, তোমাকে সবুজই ভালো মানাবে।—সবুজ চুড়ির গোছা তুলে নিয়ে, সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে অসীম প্রথম দুটো চুড়ি না ভেঙে অপর্ণার হাতে পরিয়ে দিলো।

পেছনে দাঁড়ানো উদগ্রীব জয়া, শেখর, সঞ্জয় হু-র্‌-রে করে উঠলো। অসীম সগর্বে পরের দু’গাছা একটু তাড়াতাড়ি পরাতে গিয়ে মট করে ভেঙে ফেললো। অপর্ণা বললো, আমি কিন্তু প্রত্যেক হাতে ছ’গাছা করে পরবো।

পরের দুগাছা ঢোকাতে না ঢোকাতেই ভাঙলো। তার পরের দু’গাছা কব্জি পর্যন্ত এসেও টিকলো না, অপর্ণা বললো, আপনি আমার হাত কত জোরে চেপে ধরেছেন! লাগছে, সত্যি!

শেখর বললো, অসীম, উঠে আয়, তোর কেরদানি বোঝা গেছে। তুই ভাঙতে ভাঙতে দোকানই সাফ করে ফেলবি।

অসীম বেপরোয়াভাবে জবাব দিলো, ভাঙুক না। ক’টাকার আর জিনিস আছে এখানে!

অসীমের এই স্থূল ভাষণে সঞ্জয় একটু দুঃখিত বোধ করলো। চুড়িওয়ালার দিকে তাকিয়ে সে যেন একবার নীরবে ক্ষমা চেয়ে নিলো। সঞ্জয় অনুভব করলো কি করে যেন তার মনের বিষণ্ণতা বা গুমোট ভাবটা কেটে গেছে। অনুরাধাকে সে কোনোদিন কাঁচের চুড়ি পরতে দেখেনি। অনুরাধার হাত কি শক্ত? কোনো সন্দেহ নেই, এই হাটে এলে অনুরাধাও কাঁচের চুড়ি পরতে বসে যেতো।

অপর্ণা মুখ তুলে বললো, হাতখানা কি রকম জোরে ধরেছে দেখুন না! চুড়ি পরাবেন না হাতকড়ি পরাবেন?

—দাঁড়াও, এবার ঠিক, খুব আস্তে—হাতখানা আস্তে ধরে অসীম বোধহয় চুড়িগুলো বেশি জোরে ধরেছিল, এবার একটা চুড়ি ভেঙে অপর্ণার হাতের মধ্যে ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তরতর করে বেরিয়ে এলো রক্ত, অপর্ণার ফরসা হাতের ওপরে মোটা মোটা রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে গেল। একটুও মুখ বিকৃত না করে, অপর্ণা খলখল করে হেসে উঠে বললো, বেশ হয়েছে, এবার ছাড়ুন!

অসীমের মুখ ফ্যাকাশে, বললো, ইস্! রক্ত বেরিয়ে গেল!

সে তখনো অপর্ণার হাত ধরে রক্তের দিকে চেয়ে আছে, অপর্ণা আবার বললো, এবার হাতখানা ছাড়ুন!

—রক্ত! কী হবে এখন?

—কী আর হবে! ভারি তো একটু রক্ত।

জয়া বললো, রুণি, উঠে আয়, হাতটা বেঁধে দিচ্ছি—

অপর্ণা বললো, বাঁধতে হবে না, এক্ষুণি থেমে যাবে, বেশি কাটেনি।

অসীমের মুখখানা ক্রমশ অস্বাভাবিক সাদা হয়ে এলো, গলার আওয়াজ বদলে গেছে, সে বললো, আমি রক্ত বার করে দিলাম!

অপর্ণা সেই রকমই হাসতে হাসতে বললো, ও কি, আপনি ওরকম করছেন কেন? একটু রক্ত বেরিয়েছে তো কি হয়েছে?

—মুখ দিয়ে টানলে অনেক সময় রক্ত থেমে যায়।

অবলীলাক্রমে অপর্ণা তার হাতখানা অসীমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, আপনি মুখ দিয়ে টানবেন? টানুন না।

অসীম কেঁপে উঠে বললো, না, না, আমি রক্ত সইতে পারি না— না, না।

—কী ছেলেমানুষ! ভয় পান বুঝি?

কাল সন্ধ্যেবেলা মহুয়ার দোকানে সেই নাচুনে মেয়েটার দিকে অসীম যে-রকম ভয়ার্ত ভাবে তাকিয়েছিল, আজও অসীমের দৃষ্টি ক্রমশ সেই রকম হয়ে এলো। শেখর বুঝতে পারলো অসীমের সেই পরিবর্তন। শিরা ফুটো হয়ে গেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না—কিন্তু অপর্ণার হাতের ঐটুকু ক্ষত থেকে বেশ রক্ত বেরুতে লাগলো। কয়েক ফোঁটা পড়লো মাটিতে। অপর্ণার হাত ছেড়ে দিয়ে অসীম সেই মাটিতে পড়া রক্তের দিকে তাকিয়ে রইলো।

শেখর বললো, দেখি রুণি, তোমার হাতে কাঁচ টাচ ফুটে আছে কিনা। গাঁদা গাছের পাতা রগড়ে লাগালে রক্ত এক্ষুনি থেমে যেতো। অপর্ণা উঠে দাঁড়িয়েছে, শেখর সস্নেহে তার হাতখানা নিয়ে পকেট থেকে ফরসা রুমাল বার করে মুছতে লাগলো। কাঁচ বিঁধে নেই, কিন্তু ক্ষতটা ভোঁতা ধরনের, তাই রক্ত থামতে চাইছে না।

এর মধ্যেই ওদের ঘিরে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে। বাবুদের বাড়ির সুন্দরী মেয়ের হাতে রক্ত, আর একজন ছোকরাবাবু এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে সেই মেয়ের হাত ধরে আছে। হাটের জীবনে আর তো কোনো মজা নেই, এই একটুখানি মজা। তাদের আরও আনন্দ দেবার জন্যই বোধহয় শেখর অপর্ণার হাতটা মুখের কাছে নিয়ে ক্ষতস্থানে মুখ দিলো।

অপর্ণার মুখে কোনো রেখা নেই, সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললো, রবিদা তো এলেন না।

জয়া শিউরে উঠে বললো, ইস্, অন্য কারুর রক্তও কেউ খেতে পারে! শেখরবাবু যেন একটা কি!

শেখর হাসিমুখ তুলে বললো, আমি নিজে হাত কেটে গেলে কখনো মুখ দিতে পারি না। কিন্তু মেয়েদের রক্তের স্বাদ নেবার সুযোগ তো আর কখনো পাইনি। তাই একটু চেখে নিলাম। রুণির রক্ত কি মিষ্টি!

অপর্ণা এই প্রথম নিজের ক্ষতস্থানে ভালো করে তাকালো। আপন মনে বললো, মিষ্টি বুঝি? আমি শুনেছিলাম সব রক্তের স্বাদই নোন্‌তা? রবিদা’র কি হলো? হারিয়ে গেলেন নাকি?

—কী জানি, হয়তো আমাদের খুঁজে না পেয়ে বাংলোয় ফিরে গেছে।

—চলুন, এবার আমরাও ফিরি, এ হাটের তো কিছুই দেখার নেই। তা ছাড়া এমন জলতেষ্টা পেয়েছে! ইস্‌, কতদিন যে কোকাকোলা খাইনি!

শেখর বললো, সত্যিই তো, কোকাকোলার অভাবে বালিগঞ্জের মেয়েদের তত কষ্ট হবেই! ডাব খাবে?

—ডাব পাওয়া যাবে এখানে?

না, খোঁজাখুজি করেও ডাব পাওয়া গেল না। পানীয় বলতে এখানে শুধু হাঁড়িয়ার মদ। তা দিয়ে অপর্ণার তৃষ্ণা মেটানো যাবে না। এবার ফিরতেই হবে।

হাট ভাঙতে শুরু করেছে বিকেল গাঢ় হবার সঙ্গে সঙ্গেই। খুব বেশি রাত হবার আগেই এরা অনেকে ফিরে যাবে দূর দূর গাঁয়ে। মাটির হাঁড়িতে সওদা ভরে নিয়ে দল বেঁধে চলে যাচ্ছে অনেকে। নতুন করে আসছেও দু’একটা দল। কিন্তু এ কথা ঠিক, রবি এদের মধ্যে কোথাও নেই। শেখরের ভুরু দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। ওদের ডেকে বললো, চলো, এবার ফিরি।

অসীম একটু দূরে সরে গিয়েছিল, আবার অপর্ণার পাশে এসে বিষণ্ণ সুরে বললো, তোমরা আমাদের বাংলোয় একটু বসবে? ওখানে ডেটল আছে, লাগিয়ে দিতাম—ইস্‌, এতখানি রক্ত বার করে দিলাম।

অপর্ণা পাগলাটে গলায় বললো, খবরদার, আর রক্তের কথা বলবেন না। আমার ভাল লাগছে না! আপনি ওরকম করছেন কেন?

শেখর জয়াকে জিজ্ঞেস করলো, কি, একটু বাংলোয় গিয়ে বসবে নাকি? তোমার শ্বশুরমশাই চিন্তা করবেন না তো?

জয়া উত্তর দিলো, পরমেশ্বরকে দিয়ে খবর পাঠাতে পারি। কিন্তু ছেলেটা আমার কান্নাকাটি না করে। চলুন, একটু ঘুরে আসি, আমি ঐ বাংলোতে কখনো যাইনি।

বাইরে গাছতলায় বসে ছিল পরমেশ্বর। জয়া তাকে ডেকে বললো, তুমি বাবুকে গিয়ে বলবে, আমি একটু পরে আসছি। ছোটবাবু যদি কাঁদে—আমার কাছে আসতে চায়—তবে আমার কাছে ঐ বাংলোয় দিয়ে যাবে। বুঝলে?

Facebook Comment

You May Also Like