ডাক্তারের কাছে (নুহাশ এবং আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ-২) – হুমায়ূন আহমেদ

নুহাশ এবং আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ - হুমায়ূন আহমেদ

রেবেকা নুহাশকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। কাপড় পরে তৈরি হচ্ছে। মিনহাজ বলল, আমি সঙ্গে যাই? রেবেকা বলল, না, তুমি না। তুমি তোমার বন্ধুদের কাছে যাও। ওদের সঙ্গে গল্প কর। পূর্ণিমার পরের রাতেও সুন্দর জোছনা হয়। যাও, শালবনে গিয়ে জোছনা দেখে আস। চেষ্টা করলে আজও নিশ্চই জীপটা জোগাড় করা যাবে।

মিনহাজ করুণ গলায় বলল, শুধু শুধু রাগ করছ।

আমি মোটেই রাগ করছি না। ঝগড়াও করছি না। অতীতে অসংখ্যবার ঝগড়া করেছি, কুৎসিত ঝগড়া করেছি। এখন ঠিক করেছি–আর না। তোমাকে আমি আর কখনও বিরক্ত করব না। আমি চাই না তুমিও আমাকে বিরক্ত কর।

আচ্ছা, আমি আর বিরক্ত করব না। আমি কি করলে তুমি বিরক্ত হও তার একটা লিস্ট করে বসার ঘরে টানিয়ে রাখ। এখন থেকে আমি লিস্ট মেনে চলব।

সস্তা রসিকতা আমার সঙ্গে করবে না। এ ধরনের সস্তা রসিকতা আগে অনেকবার করেছ। এগুলি পুরানো হয়ে গেছে।

ও আচ্ছা। নতুন কিছু কি বলব?

নতুন কিছু বলতে হবে না। বরং আমি তোমাকে নতুন কিছু বলি অফিস থেকে আমাকে একটা কোয়ার্টার দেবে। আমি নুহাশকে নিয়ে ঐ কোয়ার্টারে চলে যাব।

আমি সেখানে যেতে পারব না?

না।

কবে দিচ্ছে কোয়ার্টার?

খুব শিগগিরই দেবে। অল্প কিছুদিন আমি এই বাড়িতে আছি। সেই অল্প কিছুদিন তুমি যদি এ বাড়িতে না থাক তাহলে খুব ভাল হয়।

বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছ?

রেবেকা জবাব দিল না। নুহাশের কান্না পেতে লাগল। মা, বাবার সঙ্গে এরকম ঝগড়া করছে কেন? কই, বাবা তো ঝগড়া করছে না। বাবা জোছনা দেখতে গিয়েছে তো কি হয়েছে? জোছনা দেখতে ভাল লাগে, তাই দেখতে গিয়েছে। মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে নুহাশের ভাল লাগে না। মা কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে। বাবাকে নিয়ে যাবার মধ্যে অনেক রকম মজা আছে। রিকশা দিয়ে যাবার সময় যদি দেখা যায়–একজন আমড়াওয়ালা যাচ্ছে, তখন নুহাশকে কিছু বলতে হবে না। বাবা নিজেই বলবে–আমার খুব আমড়া খেতে ইচ্ছা করছে রে নুহাশ। কি করা যায় বল তো? আমড়া কিনব?

খেতে ইচ্ছা করলে কিনে ফেল।

দুজন দুটা আমড়া কিনে খেতে খেতে যাই। কি বলিস?

আচ্ছা।

দুটা আমড়া কেনা হত। বাবা আমড়ায় কামড় দিয়েই বলতেন–

বরিশালের আমড়া
বসে বসে কামড়া।

বেলুনওয়ালাকে রাস্তায় দেখা গেলে বাবা অতি অবশ্যি রিকশা থামিয়ে বলবে–দেখি আমাদের দুজনকে দুটা বেলুন দাও তো। অনেক দিন আমি বেলুন নিয়ে খেলি না। খেলতে ইচ্ছা করছে।

কত রকম মজা যে বাবা করে। রিকশায় যাবার সময়ও মাঝে মাঝে তাকে ঘাড়ে বসিয়ে রাখে। হাসতে হাসতে বলে, লোকজন কি রকম অবাক হয়ে তাকাচ্ছে দেখ রে নুহাশ–সবাই ভাবছে এই মেয়েটি এত লম্বা হল কি করে?

আমার ভয় করছে বাবা।

বেশি ভয় করছে?

হু।

আমি কি শিখিয়ে দিয়েছি? ভয় পেলে কি করতে হয়?

একটা গান গাইতে হয়।

তাহলে সেই গানটা গলা ছেড়ে গেয়ে ফেল।

আমার লজ্জা করছে বাবা।

লজ্জা করার কিছু নেই। আচ্ছা, আমিও গাচ্ছি। আমার সঙ্গে গাইলে আর লজ্জা করবে না।

দুজন এক সঙ্গে গাইতে থাকল–

দূর কর দূর কর
দূর কর ভয়।
দূর কর হে
দূর কর হে…

মার সঙ্গে বেরুলে এরকম কোন মজা নেই। চটপটি খেতে ইচ্ছা করলে–মাকে বললে লাভ হবে না। মা বলবে, এসব খেতে হয় না মা। চটপটি ভর্তি থাকে জীবাণুতে। কিলবিল করতে থাকে জীবাণু। নোংরা কুৎসিত সব জীবাণু।

ঝালমুড়ি খেতে ইচ্ছা করলে মা বলবে-তাকিয়ে দেখ ঝালমুড়িওয়ালার হাতগুলি কি ময়লা। সে তার ময়লা হাতে মুড়ি মেখে দেবে। ঐ মুড়ি খেলেই অসুখ হবে।

তারপরেও অবশ্যি মার সঙ্গে বেড়াতে যাবার অন্য রকম মজা আছে। মা এক হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। কি যে ভাল লাগে। এত আনন্দ হয়।

.

ডাক্তার সাহেব বললেন, তারপর খুকী, তোমার কি নাম?

নুহাশ।

বাহ্ কি সুন্দর নাম! দেখি খুকী, জিভটা বের কর তো।

নুহাশ জিভ বের করল। ডাক্তার সাহেব বললেন, নুহাশ নামের মানে কি খুকী?

কি অদ্ভুত ডাক্তার, জিভ বের করিয় প্রশ্ন করছে, নুহাশ নামের মানে কি? জিভ বের করে রেখে কেউ কি কথা বলতে পারে? ডাক্তার সাহেব নিজে পারবেন?

কি খুকী, নামের অর্থ বলতে পারছ না কেন?

নুহাশ জিভ ভেতরে ঢুকিয়ে বলল, নুহাশ শব্দের অর্থ হল–কম দামী ধাতু।

কম দামী মানে?

লোহা, পিতল এইসব …

ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ধাতুর নাম যদি রাখতেই হয় তাহলে রাখা উচিত দামী দামী ধাতুর নামে। যেমন প্লাটিনাম, সোনা, রূপা … খুকী জিভ ভেতরে ঢুকিয়েছে কেন? জিভ বের কর। কে রেখেছে এই নাম?

নুহাশ বলল, আমার বাবা রেখেছেন।

আহা, আবার জিভ ভেতরে ঢুকালে। বাচ্চাদের নিয়ে এই যন্ত্রণা। কথা শুনতে চায় না।

ডাক্তার সাহেব নানান ধরনের পরীক্ষা করলেন। অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন–হাঁটুতে ব্যথা হয় কি-না। গভীর রাতে খিদে পায় কি-না। চোখ দিয়ে পানি পড়ে কি-না। ঠোঁট শুকিয়ে যায় কি-না। শেষমেশ বললেন, আমি তো তেমন কিছু পাচ্ছি না।

রেবেকা বলল, হঠাৎ হঠাৎ জ্বর আসে। আকাশ-পাতাল জ্বর।

ডাক্তার বললেন, আকাশ-পাতাল জ্বর আবার কি?

অনেক বেশি জ্বর। একশ চার। একশ পাঁচ।

আমি কিছু টেস্টের কথা লিখে দিয়েছি। থরো চেক আপ হোক। কোন একটা ভাল জায়গা থেকে টেস্টগুলি করাবেন। ব্যাঙের ছাতার মত ল্যাবোরেটরি গজিয়েছে। এজনের টেস্টের সঙ্গে আরেকজনের টেস্টের মিল নেই। আমাদের চিকিৎসা করতে হচ্ছে অনুমানে। আপনি টেস্টগুলি করিয়ে দিন পনেরো পরে আসুন। ও কি, খুকী তুমি এখনো জিভ বের করে আছ কেন?

নুহাশ বলল, আপনি তো জিভ ভেতরে ঢুকাতে বলেন নি।

ডাক্তার সাহেব হো হো করে হেসে ফেললেন। নুহাশ মনে মনে বলল, আজ সারাদিনে একজনকে মাত্র হাসাতে পেরেছি। কোন রকমে আরো দুজনকে যদি হাসানো যেত তাহলে চমৎকার হত।

রাস্তায় নেমে রেবেকা বললেন, কিছু কিনতে ইচ্ছে করছে নুহাশ?

না।

ইচ্ছা করলে বল। চকলেট? চকলেট খেতে ইচ্ছা করছে?

হু।

রেবেকা তিন শ টাকা দিয়ে এক টিন কেডবেরিজ চকলেট কিনল। আজ সে বেতন পেয়েছে। বেশ কিছু টাকা ব্যাগে। নুহাশের জন্যে কখনো তেমন কিছু কেনা হয় না। অসুস্থ মেয়ে…

রিকশায় উঠে রেবেকা বলল, টিনটা খুলে একটা মুখে দাও মা।

নুহাশ বলল, বাবাকে নিয়ে খুলব।

বাবাকে কি তোমার বেশি ভাল লাগে মা?

নুহাশ চুপ করে রইল। বাবাকে তার আসলেই অনেক বেশি ভাল লাগে। কিন্তু মাকে এই কথা বললে মা মন খারাপ করবে।

নুহাশ, কথা বলছ না কেন? বাবাকে কি তোমার বেশি ভাল লাগে?

না।

আমাকে বেশি ভাল লাগে?

না।

তাহলে কি দাঁড়াল? কাউকেই ভাল লাগে না?

দুজনকে সমান সমান ভাল লাগে।

দেখ মা, তুমি এখন কথা বলছ ডিপ্লোমেটের মত। ডিপ্লোমেট কি জান তো? ডিপ্লোমেট হচ্ছে রাজনীতিবিদ। এরা কি করে? এরা সবাইকে খুশি করতে চায়। তোমার যা বয়স তাতে সবাইকে খুশি দরকার নেই। তুমি যদি তোমার বাবাকে বেশি ভালবাস তাহলে সেটা বলবে। সত্যি কথা বলার অপরাধে তো তোমাকে আমি শাস্তি দেব না।

আমি তোমাকেই বেশি ভালবাসি মা।

তোমার বাবাকেও নিশ্চয়ই তুমি একই কথা বর। তাকেও নিশ্চয়ই তুমি বল-তোমাকেই আমি সবচে বেশি ভালবাসি বাবা।

না, বলি না। তুমি সব সময় জানতে চাও কাকে বেশি ভালবাসি। বাবা কখনো জানতে চায় না।

জানতে চাইলে বলতে?

হু।

তাহলে কি মিথ্যা কথা বলা হল না? একই সঙ্গে কি দুজনকেই বেশি ভালবাসা যায়?

যায়।

রেবেকা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, শোন নুহাশ, আজ রাতে তোমাকে কিছু জরুরী কথা বলা হবে। তুমি চকলেট খেতে খেতে খুব মন দিয়ে কথাগুলি শুনবে।

আচ্ছা।

তোমার হয়ত শুনতে ভাল লাগবে না। তবু শোনা দরকার।

আচ্ছা।

দেখি জ্বর আছে কি-না।

রেবেকা জ্বর দেখল। তার মুখ বিষণ্ণ হয়ে গেল। সে নিচু গলায় বলর, হুঁ, আবার জ্বর আসছে মনে হচ্ছে। কি হচ্ছে এসব? দুদিন পরপর জ্বর!

রেবেকা বাড়ি ফিরে দেখল বাড়িতে হুলস্থূল হচ্ছে। মিনহাজ রান্না করছে। মুনার-মা শুকনো মুখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে। ঘরময় থালাবাটি ছড়ানো। খাবার টেবিলের উপর একটা বঁটি। সবজি কাটা হচ্ছে টেবিলে।

মিনহাজ হাসিমুখে বলল, রান্না করছি। রান্নাবান্না করে তোমার মন ভুলানোর চেষ্টা। কি রান্না হচ্ছে জান? হাঙ্গেরিয়ান গোলাস। অপূর্ব! একবার খেলে কোরমা পোলাও মুখে রুচবে না। কোরমা পোলাও মুখে দিয়ে থু করে ফেলে দেবে!

রেবেকা কিছু না বলে শোবার ঘরে ঢুকল। নহাশকে শুইয়ে দিল বিছানায়। নুহাশ বলল, মা আমি বাবার রান্না দেখব।

না তোমাকে বাবার রান্না দেখতে হবে না।

আমার দেখতে ইচ্ছে করছে মা।

অন্য আরেকদিন দেখবে।

রেবেকা শোবার ঘরের বিছানায় বসে আছে। তার মাথা ধরেছে। মিনহাজের ছেলেমানুষি হৈচৈ অসহ্য বোধ হচ্ছে। এরচে সে বন্ধুর বাড়িতে থাকলেই ভাল হত।

মুনার-মা এসে বলল, বাড়িওয়ালা আসছে। আপনের সঙ্গে কথা বলতে চায়।

রেবেকা বিরক্ত স্বরে বলল, আমার সঙ্গে কি কথা? নুহাশের বাবা ঘরে আছে। তার সঙ্গে কথা বলত বল।

বলছিলাম। উনি আপনের সাথে কথা বলতে চায়।

বসতে বল। আমি যাচ্ছি।

বাড়িওয়ালা সিদ্দিক সাহেব অন্য বাড়িওয়ালাদের মত না। তিনি বেশ দ্র। কথাবার্তায় অমায়িক। নতুন মাস শুরু হওয়া মাত্র ভাড়ার জন্যে তাগিদের পর তাগিদ পাঠানোর অভ্যাসও তাঁর নেই।

রেবেকা বলল, কেমন আছেন?

সিদ্দিক সাহেব বললেন, ভাল আছি।

কি ব্যাপার বলুন তো?

সিদ্দিক সাহেব বিব্রত গলায় বললেন, না, তেমন কোন ব্যাপার না। অকারণেই এসেছি বলতে পারেন।

অকারণে তো আসেন নি। নিশ্চয়ই কোন কারণে এসেছেন। বলুন…

বাড়িভাড়া নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।

বাড়িভাড়া বাড়াতে চান?

আরে না, বাড়িভাড়া বাড়াব কেন? বছর বছর বাড়িভাড়া বাড়ানোর অভ্যেস আমার নেই। দুবছর তো আছেন আমার এখানে। দুবছরে বাড়িভাড়া বাড়িয়েছি?

না।

আমি এসেছি কারণ অনেক দিন বাড়িভাড়া দেয়া হয় না…

রেবেকা বিস্মিত হয়ে বলল, অনেক দিন বাড়িভাড়া দেয়া হয় না মানে? কত দিন দেয়া হচ্ছে না?

এই মাস নিয়ে পাঁচ মাসের ভাড়া বাকি পড়ল।

সে কি?

সিদ্দিক সাহেব বললেন, টাকাপয়সার সমস্যা সময় সময় হতেই পারে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। না হওয়াটাই বরং বিচিত্র। তবু একসঙ্গে অনেক জমে গেলে…

আমি আগামীকালই আপনার বাড়িভাড়া মিটিয়ে দেব। এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না।

না না, আমি চিন্তা করি না। আজ তাহলে উঠি।

সিদ্দিক সাহেব উঠে গেলেন। রেবেকা চোখে পানি এসে গেল। এ কি কাণ্ড! বাড়িভাড়া মিনহাজের দেয়ার কথা। রেবেকা সংসার চালানোর যাবতীয় খরচ দেয়। মিনহাজের শুধু বাড়িভাড়া, গ্যাস এবং ইলেকট্রিসিটির বিল দেবার কথা। সে যখন পাঁচ মাস বাড়িভাড়া দেয় নি। গ্যাস, ইলেকট্রিসিটির বিলও নিশ্চয়ই দেয় নি।

রেবেকা রান্নাঘরে ঢুকল। মিনহাজ কড়াইয়ে তেল চাপিয়েছে। সে খুব ব্যস্ত। পাঞ্জাবীর হাতা গুটিয়ে নিয়েছে। গুনগুন করে গানও গাওয়া হচ্ছে।

আজি এ বসন্তে
কত ফুট ফুটে
কত পাখি গায়…

রেবেকা শীতল গলায় বলল, গান বন্ধ কর। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।

মিনহাজ হাসিমুখে বলল, তুমি কি বলবে তা আমি জানি। সিদ্দিক সাহেব এসেছিলেন সেই খবর পেয়েছি। পাঁচ মাস বাড়িভাড়া দেয়া হয়নি এই তো? এটা কোন বড় ব্যাপার না।

তোমার ধারণা খুবই তুচ্ছ ব্যাপার?

ইয়েস মাই ডিয়ার ইয়াং লেডি। আমার তাই ধারণা। আমি যখন পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করব তখন তোমারও তাই ধারণা হবে। তুমি বসার ঘরে বস। আমি রান্না শেষ করেই আসছি। দশ মিনিটের বেশি লাগবে না।

রেবেকা বসার ঘরে এসে চুপচাপ বসে রইল। মিনহাজ ঘরে ঢুকল আধ ঘণ্টা পর। মিনহাজের হাতে দুকাপ চা।

চা বানিয়ে আনলাম। চা খেতে খেতে আমার ব্যাখ্যা শোন। মুখ এমন গম্ভীর করে রাখার দরকার নেই। তুমি এমন ভাব করছ যেন নিকট আত্মীয় কেউ মারা গেছে। কেউ মারা যায় নি। সবাই ভাল আছে।

তুমি কি বলতে চাচ্ছ তাই বল।

ব্যাপার হল কি-বদরুলের মা অসুস্থ হয়ে পড়ল। বুড়ো বয়সে অসুখ বিসুখ হলে সিরিয়াস অবস্থা হয়। জোয়ানদের যেখানে একটা অষুধে কাজ হয় বুড়োদের সেখানে লাগে দশটা অষুধ। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে বদরুলের অবস্থা হয়ে গেল কেরাসিন। কেরাসিনের চেয়েও খারাপ। বদরুলের অবস্থা হলে গেল পেট্রোল। আমি তাকে গত পাঁচ মাসের বাড়িভাড়ার টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি।

জনসেবা?

জনসেবা না। জনসেবা করার ক্ষমতা আমার কোথায়? বন্ধুসেবা বলতে পার।

বাড়িভাড়া তুমি দিচ্ছ না এটা আমাকে জানাতে অসুবিধা ছিল?

ছিল। তুমি রাগ করতে। আমি তোমাকে রাগাতে চাচ্ছিলাম না। তবে তুমি কোন রকম চিন্তা করবে না। প্রভিডেন্ট ফান্ডের লোনের জন্যে দরখাস্ত করেছি। লোন গ্রান্টেড হয়েছে। চা খাচ্ছ না কেন, চা খাও।

রেবেকা চায়ের কাপ হাতে নিল না। শীতল গলায় বলল, নিজের সংসারের প্রতি, নিজের স্ত্রী এবং সন্তানের প্রতি তুমি কোন রকম দায়িত্ব অনুভব কর না। তাই না?

আরে কি যে বল, দায়িত্ব অনুভব অবশ্যই করি।

না, কর না। সামান্যতম দায়িত্বও যদি থাকত তাহলে আমরা বাড়ি ফেরা মাত্র তুমি জিজ্ঞেস করতে, ডাক্তার নুহাশ সম্পর্কে কি বলল। জিজ্ঞেস করেছ?

জিজ্ঞেস করি নি কারণ তোমাদের মুখ দেখেই মনে হয়েছে, ডাক্তার বলেছেন–সব ঠিকঠাক আছে। ডাক্তার কোন অষুধপত্রও দেন নি। অষুধপত্র দিলে সঙ্গে থাকতো। সঙ্গে কিছুই নেই। শুধু নুহাশের হাতে এক টিন চকলেট।

রেবেকা স্বাভাবিক গলায় বলল, নুহাশের জন্মের সময়ের কথা মনে আছে?

কোন কথা বল তো?

নুহাশের জন্মের এক সপ্তাহ আগে তুমি যে দেশ ভ্রমণে বের হয়ে গেলে।

ও আচ্ছা। বাংলাদেশের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় হেঁটে যাওয়া টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া।

হ্যাঁ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। তুমি জানতে যে কোন দিন নুহাশের জন্ম হতে পারে। তা জেনেও আমাকে একা ফেলে তুমি তোমার সেই বিখ্যাত টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ভ্রমণ শুরু করলে। কেন করলে?

এরও একটা ব্যাখ্যা আছে। সুন্দর ব্যাখ্যা। শুনলেই তোমার মনে হবে ঠিক ঐ সময়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ভ্রমণ ছিল খুবই প্রয়োজনীয়।

ব্যাখ্যাটা শুনবে?

না। তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে এগারো বছর। এই এগারো বছর শুধু ব্যাখ্যাই শুনেছি। আর শুনতে ইচ্ছা করছে না। আমি খুব খুশি হব তুমি যদি এই বাসা ছেড়ে এখন চলে যাও। তোমাকে আগেও একবার বলেছি, আজও বলছি, আমি তোমার সঙ্গে বাস করতে পারব না।

এখন চলে যেতে বলছ?

হ্যাঁ এখনই চলে যেতে বলছি। যাবার সময় তোমার হাঙ্গেরিয়ান গোলাস নিয়ে যেও। এই বস্তু আমি খাব না। আমি আমার মেয়েকেও খেতে দেব না।

লঘু পাপে গুরু দণ্ড হয়ে যাচ্ছে না?

না। তোমাকে আমি শাস্তি দিচ্ছি না। তোমাকে আমি যা দিচ্ছি তা হচ্ছে মুক্তি।

রেবেকা উঠে দাঁড়াল। মুনার-মাকে বলল–খাবার যা রান্না হয়েছে একটা টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে নিয়ে আস। পুরোটা টিফিন ক্যারিয়ারে ঢুকাবে। এতটুকুও যেন না থাকে।

রেবেকা মিনহাজের সামনে টিফিন ক্যারিয়ার রেখে সহজ স্বাভাবিক গলায় বলল, এই নাও তোমারা খাবার। এখন যেখানে যেতে ইচ্ছে, যাও।

সত্যি সত্যি যেতে বলছ?

হ্যাঁ বলছি। তোমাকে দেখলেই আমার মেজাজ খারাপ হবে। ঝগড়া করব। এসব আর ভাল লাগছে না। তুমিও শান্তিতে থাক। আমাকেও শান্তিতে থাকতে দাও। দয়া করে এখন উঠ।

মিনহাজ উঠল। ক্লান্ত গলায় বলল, আচ্ছা যাচ্ছি। টিফিন ক্যারিয়ারটা থাকুক। খাবারটা ভাল হয়েছে। আমি মানুষ খারাপ কিন্তু ভাল রাঁধুনি।

টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে যাও।

আচ্ছা নিচ্ছি। মুখ এমন কঠিন করে রেখ না রেবেকা। যাবার সময় তোমার হাসিমুখে দেখে যাই। এই পৃথিবীতে হাসিমুখ দেখা দুর্লভ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর কথা বাড়িও না। রাত হচ্ছে–রওনা হয়ে যাও।

নুহাশকে দেখে যাই।

ও ঘুমুচ্ছে। ওর ঘুম ভাঙানোর কোন প্রয়োজন দেখছি না।

আচ্ছা।

মিনহাজ টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বের হয়ে গেল।

রাতে নুহাসশকে ঘুম থেকে তোলা হল রাতের খাবার খাওয়ার জন্যে।

নুহাশ বলল, বাবা কোথায় মা?

রেবেকা বলল, বাইরে গেছে।

নুহাশ বলল, বদরুল চাচার বাসায়?

হতে পারে, আমি জানি না।

নুহাশের প্রিয় খাবারের একটি হচ্ছে ডিম ভাজা। প্রিয় খাবারই তাকে দেয়া হয়েছে। নুহাশ বলল, বাবা যে রান্না করেছে সেটা একটু খাব মা।

ঐ খাবার ছোটদের জন্যে না।

তবু একটু খাব। অল্প একটু।

ঐ খাবার তোমার বাবা নিয়ে গেছেন।

নুহাশ বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছে। ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। রেবেকা বলল, তোমাকে বলেছিলাম না, আজ রাতে খুব জরুরী কিছু কথা তোমাকে বলব।

হ্যাঁ বলেছিলে।

ভাত খেতে খেতে আমার কথাগুলি মন দিয়ে শোন। তোমার বাবা একজন ভাল মানুষ। শুধু ভাল মানুষ বললে কম বলা হয়। খুবই ভাল মানুষ। হাসি খুশি, পরোপকারী।

পরোপকারী কি মা?

পরোপকারী হচ্ছে যে অন্যের উপকার করে বেড়ায়। ঐ যে দেখ– তোমার বদরুল চাচার মার অসুখ হল। খবর পেয়ে সব কাজকর্ম ফেলে তোমার বাবা পড়ে রইল সেখানে। একে বলে পরোপকার। যে কথা বলছিলাম, তোমার বাবা একজন ভাল মানুষ। সবাই তাকে পছন্দ করে। তুমিও কর। কর না?

হ্যাঁ করি।

সবার কাছেই তোমার বাবা প্রিয়। আমার কাছেও এক সময় খুব প্রিয় ছিল।

এখন না?

না, এখন না। শুধু এখন না, অনেক দিন থেকেই প্রিয় না। তোমার সামনেই তো আমরা ঝগড়া করি। করি না?

বাবা তো ঝগড়া করে না।

তা ঠিক তোমার বাবা ঝগড়া করে না। সে হাসিমুখে আমার সামনে বসে থাকে। যখন আমি খুব কঠিন কথা বলি, সে হো হো করে হাসে। হো হো করে হাসার মানে হচ্ছে তোমার কথায় আমি কান দিচ্ছি না। তুমি যা ইচ্ছা বল। কিছুই যায় আসে না। এই করে সে আমাকে আরো রাগিয়ে দেয়। কাজেই হাসিমুখে সামনে বসে থেকেও সে কিন্তু আসলে ঝগড়া করছে। ঠিক বলছি না মা?

হ্যাঁ ঠিক বলছ।

দিন রাত ঝগড়া করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আর ঝগড়া করতে, রাগারাগি করতে ভাল লাগছে না। আমি ঠিক করেছি আমি এমন কিছু করব যাতে আর ঝগড়া না হয়। এটা ভাল না মা?

হ্যাঁ ভাল। খুব ভাল।

কি করলে আর কখনো আমাদের ঝগড়া হবে না বল তো নুহাশ?

আমি জানি না।

দুজন যদি আলাদা থাকি। মাঝে মাঝে তোমার বাবা আসবে। হৈচৈ, গল্পগুজব করবে। তোমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে। তারপর আবার চলে যাবে নিজের জায়গায়।

বাবা কোথা থাকবে?

সেটা তোমার বাবা ঠিক করবে। তার যেখানে থাকতে ভাল লাগে সে সেখানেই থাকবে। বন্ধুর বাসায় থাকবে, কিংবা হোটেলে থাকবে। আবার একটা বাসা ভাড়া করেও থাকতে পারে।

বাবাকে কে বেঁধে দেবে?

রান্নার জন্যে সে কোন একটা লোক রাখবে। কিংবা নিজেই রাঁধবে। আজ সে নিজে রাঁধল না?

নুহাশ করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। রেবেকা বলল, তোমার বাবা এবং আমি আমরা দুজন যদি আলাদা থাকি তাহলে সবার জন্যেই ভাল হয়। তোমার বাবার জন্যে ভাল হয়, কারণ তাহলে সে নিজের মত করে থাকতে পারে। বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারে, ঘুরে বেড়াতে পারে, জোছনা দেখার জন্যে বনে জঙ্গলে থাকতে পারে। আমার জন্যে ভাল হয় কারণ আমিও তাহলে নিজের মত করে থাকতে পারি। আমাকে ঝগড়া করতে হয় না। তোমার বাবাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না। তোমার জন্যেও ভাল হয়, কারণ তোমাকে তাহলে কোন ঝগড়া শুনতে হয় না। ঝগড়া শুনতে কি তোমার ভাল লাগে মা?

না।

কাজেই দেখ, তোমার জন্যেও ভাল হল। তোমাকে আর ঝগড়া শুনতে হবে না। এখন যাও হাত ধুয়ে দাঁত মেজে শুয়ে পড়। আমার বিছানায় শোও। এখন থেকে আমরা দুজন এক বিছানায় শোব।

হাত ধুতে ধুতে নুহাশ বলল, আমার একা ঘুমুতেই ভাল লাগে মা।

আমার সঙ্গে ঘুমুতে চাও না?

না।

তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ নুহাশ?

না, আমি রাগ করি নি।

আমার তো মনে হয় করেছ।

না করি নি।

.

নুহাশের ঘুম আসছে না। কিন্তু ঘুমের ভান করে সে শুয়ে আছে। ঘরের কাজকর্ম সেরে অনেক রাতে মুনার-মা নুহাশের ঘরে ঘুমুতে এল। এই ঘরেই সে পাটি পেতে ঘুমুয়। নুহাশ মুনার-মাকে দেখে বিছানায় উঠে বসে নিচু গলায় বলল, বুয়া, আমার বাবা-মা কি ভাল মানুষ, না মন্দ মানুষ?

মুনার-মা হাই তুলতে তুলতে বলল, আল্লাহ পাকের দুনিয়ায় সব মানুষই ভাল। আবার সবই মন্দ। মানুষ বড় বিচিত্র গো আফা।

নুহাশের আরো কিছু কথা জিজ্ঞেস করার ছিল কিন্তু মুনার-মা ঘুমিয়ে পড়েছে।

একবার ঘুমিয়ে পড়লে তাকে জাগানো খুব মুশকিল।

Facebook Comment

You May Also Like